বুধবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি.
সাপ্তাহিক জন্মভূমি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ কী ধর্ষণের অভয়ারণ্য?

০৪-অক্টো-২০২০ | jonmobhumi | 504 views

Spread the love

অনিল মো. মোমিন ঃ অনলাইনে সর্বদা খবর পড়লেও করিম সাহেবের বাসায় প্রতিদিন দুইটা জাতীয় দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়। উনার একমাত্র মেয়ে নাদিয়া এবার নবম শ্রেণিতে পড়ে। করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় নাদিয়া পড়াশোনা পাতাসহ অন্যান্য খবর পড়ে সময় কাটায়। কিছু দিন আগ্রহ নিয়ে পড়লেও প্রতিদিনই পত্রিকা পাতাজুড়ে ধর্ষণ-গণধর্ষণের খবরে আস্তে আস্তে তার খারাপ লাগা শুরু হয়। একদিন সে পত্রিকায় দেখতে পায় তারই বান্ধবী নিতুর প্রাইভেট শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণের খবর। খবরটি মাতৃহারা নাদিয়াকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলে। বিষয়টি আঁচ করে করিম সাহেব বাসায় পত্রিকা বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে ফাতেমার বন্ধু-বান্ধবরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ট্যুর, গেট টুগেদার আয়োজন করলেও নিরাপত্তার অজুহাতে ফাতেমার মা তাকে কোথাও যেতে দেন না। তার মায়ের একটাই কথা বিয়ের পর স্বামীর সাথে ঘুরবে। গত পরশুদিন স্বামীর সাথে সিলেটের এমসি কলেজে ঘুরতে গিয়ে তরুণী গণধর্ষণ হওয়ার ঘটনার পর ফাতেমার মা মেয়েকে এরপর আর কী বলবেন?

আপনার কাছে এ প্রশ্নের উত্তর আছে? নেই। এবার চোখ বন্ধ করে ভেবে বলুন তো এমন কোনো দিন কী পেয়েছেন যেদিন পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় কোনো ধর্ষণের সংবাদ ছিল না? ‘প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ’, ‘এসএমএস করে ডেকে নিয়ে স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ’, ‘সিঁদ কেটে ঘর থেকে তুলে নিয়ে শিশুকে ধর্ষণ’, ‘হাসপাতালে কিশোরী ধর্ষণ’, ‘রাজধানীতে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ’, ‘যাত্রীবাহী বাসে তরুণীকে গণধর্ষণ’, ‘ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণ’, ‘স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণে পুলিশ সদস্য গ্রেফতার’, ‘দুই কিশোরীকে দলবেঁধে ধর্ষণ’ এসব শিরোনামের বাইরে কিছু মনে পড়ছে কী? এত গেল গত দু’সপ্তাহের সংবাদ শিরোনামের সংক্ষিপ্ত সংকলন। বাবা, দাদা, শ্বশুর, দুলাভাই, শিক্ষক, পুলিশ, সেনাবাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদরাসা-মন্দিরের ইমাম-হুজুর-পুরোহিতও এখন ধর্ষক। মসজিদ-মন্দির, নিজের বাড়ি, ঝোপঝাড় থেকে অভিজাত হোটেল সবই যেন ধর্ষকদের অভয়ারণ্য। তাহলে বাংলাদেশ কী ধর্ষণের অভয়ারণ্য হতে চলছে?

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছে ৮৮৯ জন্য অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ধর্ষিত হয়েছে প্রায় ৪ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জন, ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৯ জন, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৪২ জনকে। একই সংস্থার বাৎসরিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৩৭৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৮৬টি, গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৮টি। সংস্থাটির তথ্যমতে ২০১৫ সালে সারাদেশে ৪৮৪টি একক ধর্ষণ, ২৪৫টি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। একইভাবে ২০১৬ সালে ৪৪৪টি একক ধর্ষণ, ১৯৭টি গণধর্ষণসহ মোট ৬৫৯টি ধর্ষণকা- ঘটেছে। ২০১৭ সালে সারাদেশে ধর্ষণের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১৮টিতে যেখানে ৫৯০টি একক ধর্ষণ, ২০৬টি গণধর্ষণের ঘটনা ছিল। ৫০২টি একক ধর্ষণ ও ২০৩টি গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে ২০১৮ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে ৭৩২টি ঘটনা তে এসে দাঁড়ায়। আসকের মতে, ৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটে। ওই বছর সারাদেশে ১৪১৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে শুধু একক ধর্ষণ হয়েছে ১ হাজার ৬৬টি, গণধর্ষণ ৩২৭টি। প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৪৬ জনকে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন আরো ৪৮ জন। আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী গত আট বছরে সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৮ হাজার ৭৮টি। এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬২৬ জনকে। সংস্থাটি আরো বলছে ২০১৯ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা ১ হাজার ৬০৭টি। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৭ জনকে। এমন ভয়াবহ তথ্য আমাদের অবচেতন মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয় ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কী গণধর্ষণতন্ত্রী বাংলাদেশে পরিণত হচ্ছে?

আচ্ছা ধর্ষণের কারণ কী? পোশাক! আসকের তথ্যানুযায়ী গত আট মাসে ছয় বছরের নিচে ৬০ জন শিশু ধর্ষিত হয়েছে। আর ৭-১২ বছর বয়সী ধর্ষিত হয়েছে ১৩৩ জন। ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে ধর্মীয় পোশাক পরে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে গিয়ে ধর্ষণের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে দেশজুড়ে। এছাড়া বিধবা ধর্ষণ, ঘর থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, বৃদ্ধ মহিলা ধর্ষণের মতো খবর পত্রিকা মারফত আমাদের দেখতে হয়েছে। এসব তথ্য পোশাকের খোঁড়া যুক্তিকে ধুলোয় উড়িয়ে দেয়। ধর্ষণের পেছনে বিকৃত মানসিকতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, অবাধ পর্নোগ্রাফি, মাদকের প্রভাব, পরিবার থেকে যথার্থ শিক্ষার অভাব ইত্যাদি কারণ চিহ্নিত করা হয়। সর্বোপরি ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব। এসব থেকে উত্তরণের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিচার নিশ্চিতে দেশের প্রচলিত আইনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন, নারীবাদী সংগঠন ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও প্রতিনিয়ত ধর্ষণ বেড়েই চলছে। চারদিকে ধর্ষকদের অবাধ বিচরণ দেখে মনে হচ্ছে ধর্ষকেরা এদেশে ধর্ষণের জন্য এনওসি পেয়ে গেছে। বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে বা অন্য নানা কাজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) বা অনাপত্তি সনদ প্রদান করে থাকে।

পরিসংখ্যান বলছে ক্রমবর্ধমান হারে দিন দিন ধর্ষণ বেড়েই চলছে। এর পেছনে প্রধান কারণ কী? নিঃসন্দেহে বলা যায় এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। দেশের ঘাড়ে জেঁকে বসা বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এখনো বিচার নিশ্চিত হয়নি আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যার, ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চার সন্তানের জননী গণধর্ষণের, বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনাসহ অনেক ধর্ষণ মামলার। সংসদে আইন প্রণেতারা ধর্ষকদের ক্রসফায়ার দেয়ার রব তুললেও ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের তেমন নজর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনে ত্রুটি, পুলিশি তদন্তে ত্রুটি এবং অবহেলা, ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের চাপ এবং সামাজিক কারণ। সাধারণত কোনো ধর্ষণের ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি না হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হয় না। আবার আলোচিত মামলাগুলোও অদৃশ্য কারণে ধীর গতিতে চলে। পুলিশ সদর দফতর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে বিচারের জন্য ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দেড় লক্ষাধিক মামলা ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচার চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩.৬৬ শতাংশ মামলা। আর সাজা পাচ্ছে হাজারে মাত্র সাড়ে চারজন। সাজার হার ০.৪৫ শতাংশ।

মহামারীর মতো জেঁকে বসা এই ব্যাধি দূর করতে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, এই সামাজিক ব্যাধি দূরীকরণে সবার আগে দরকার সম্মিলিত সদিচ্ছা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলাগুলো বিচার করতে হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। ধর্ষকরা দেশ ও সমাজের জন্য বিষফোঁড়া। রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনকে ধর্ষকদের ব্যাপারে হতে হবে জিরো টলারেন্স। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সঙ্গে মৃত্যু না হলে মৃত্যুদ- নেই। শুধু যাবজ্জীবন কারাদ- এবং অর্থদ- বা উভয় দ-। ধর্ষণ একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। এটি শারীরিক নিপীড়নের পাশাপাশি ভিকটিমকে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে। বিনা দোষে ধর্ষিতাকে সমাজে হেয় হতে হয়। তাই প্রচলিত আইনের সংস্কার করে আরো কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। চীনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ- হলেও কখনো কখনো পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে মৃত্যুদ- কার্যকর করার আগে ধর্ষকের যৌনাঙ্গ কেটে দেয়া হয়। উত্তর কোরিয়া ধর্ষণের শাস্তির জন্য রয়েছে ফায়ারিং স্কোয়াড। এছাড়াও ইরান, আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গুলি করে বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, সৌদি আরবে জনসমক্ষে শিরচ্ছেদ করে ধর্ষণের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। এদেশের বিদ্যমান আইনে আরেকটি বড় ত্রুটি হলো ধর্ষিতা নারীকে প্রমাণ করতে হয় সে ধর্ষিত হয়েছে। এ প্রমাণ দিতে গিয়ে তাকে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হওয়ার মতো। এর ফলে অনেক ধর্ষিতা মুখ খোলেন না, আইনের আশ্রয় নেন না। তাই এ ব্যবস্থা পাল্টে ধর্ষককে প্রমাণ করতে হবে সে ধর্ষণ করেনি। ধর্ষকদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। ধর্ষণের নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে বাসে ধর্ষণ। বাস চালকরা অধিকাংশই অশিক্ষিত, নেশাখোর আর নিকৃষ্ট মানসিকতার। এদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া ধর্ষণ প্রতিরোধে দায়বদ্ধতা বাড়াতে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী আরেক কর্মী দ্বারা ধর্ষিত হলে প্রতিষ্ঠান প্রধানকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ঘৃণ্য এই অপরাধ দমনে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মেয়েদের সরকারি উদ্যোগে কারাতে বা মার্শাল আর্ট শেখানো যেতে পারে। সর্বোপরি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের বিকল্প নাই। আপনার একটা মেয়ে আছে, একটা বোন আছে এই ভয় নিয়ে আপনাকে যেন দিনগুলো অতিবাহিত না করতে হয় সেজন্য এখনই ধর্ষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন।

সার্চ/অনুসন্ধান করুন