সোমবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সফর, ১৪৪৪ হিজরি.
সাপ্তাহিক জন্মভূমি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

রোববার সারাদেশে টিকা দেয়া শুরু করতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

০৬-ফেব্রু-২০২১ | jonmobhumi | 313 views

Spread the love

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের এক বছর পার হওয়ার আগেই টিকা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে রোববার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, সারাদেশের এক হাজারেরও বেশি হাসপাতালে এই টিকা কার্যক্রম চলবে। এ জন্য কাজ করবে মোট দুই হাজার ৪০০টি দল। এর মধ্যে ঢাকার জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির স্টোর থেকে টিকার ডোজ কোল্ড বক্সে সংরক্ষণ করে ৬৪টি জেলার বিভিন্ন কেন্দ্র এবং প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর আগে টিকা সংরক্ষণ, টিকা দেয়া, টিকা কেন্দ্র পরিচালনা ও টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ সববিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা ইয়াসমিন জানান, রোববার সকাল থেকে টিকা দেয়া শুরু করার সব প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি টিকার ব্যাপারে মানুষকে আগ্রহী করতে তারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আমরা সাড়ে তিন হাজার ডোজ টিকা পেয়েছি। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণের সক্ষমতা আমাদের আছে। টিকা দেয়ার পর ৩০ মিনিট অবজারভেশনে রাখতে হয়। ওই ব্যবস্থাও আমাদের আছে। প্রস্তুতির ঘাটতি নেই। আমাদের লক্ষ্য রোববার অন্তত ১০০ জনকে টিকা দেয়া।’

এ ছাড়া তিনি আরো জানান, উপজেলার ৫৫ বছরের বেশি যাদের বয়স তাদেরকে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে এলাকায় মাইকিং করার পাশাপাশি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছ থেকে ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে সব ব্যক্তিদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টিকা নিতে আগ্রহীদের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অর্থাৎ নাম, ঠিকানা, বয়স, পেশা, শারীরিক পরিস্থিতি, জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বর ও ফোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। কারণ নিবন্ধন ছাড়া টিকা দেয়া যাবে না।

বিভিন্ন কারণে যারা অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারছেন না তাদের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে তথ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে স্পট রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে স্পট রেজিস্ট্রেশন যেদিন হবে, ওই দিনই টিকা দেয়া যাবে না। তাদেরকে নতুন আরেকটি তারিখ দেয়া হবে।

শনিবার দুপুর পর্যন্ত তিন লাখ ২৮ হাজারের বেশি মানুষ অনলাইনে নিবন্ধন করেছে। এ ছাড়া আরো অনেক মানুষ স্পট রেজিস্ট্রেশন করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক এ বি এম খুরশীদ আলম। তিনি জানান, যারা অনলাইন নিবন্ধন করেও টিকার তারিখ ও কেন্দ্রের বিষয়ে এসএমএস পাননি তারা শনিবার রাতের মধ্যেই ম্যাসেজ পেয়ে যাবেন। কালকে না হলেও তারা অন্য যেকোনো দিন টিকা দিতে পারবেন।

শনিবার ঢাকার কয়েকটি কেন্দ্রের প্রস্তুতি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে কয়েকটি হাসপাতালের ঘাটতির চিত্র উঠে আসে।

খুরশীদ আলম বলেন, ‘মোটামুটি সব কেন্দ্রেই প্রস্তুতি ভালো আছে। তবে কিছু ছোট ছোট কেন্দ্রে কিছুটা প্রস্তুতির অভাব আছে। এটি সকাল বেলার কথা। আশা করি আমরা আজকের মধ্যে তা সম্পন্ন করতে পারবো। কোনো কেন্দ্রে সমস্যা থাকলে আমরা চেষ্টা করবো এখান থেকে সমাধান করতে।’

রোববার সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথমে টিকা দেবেন বলে জানা গেছে। এরপর প্রধান বিচারপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী, জন প্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও টিকা নেবেন বলে জানা গেছে। এরপর সম্মুখ-সারির বিভিন্ন পেশার মানুষ অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা এবং যাদের বয়স ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বে তাদেরকে বিনামূল্যে টিকা দেয়া হবে।

এভাবে এক দিনে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি টিকা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত টিকা কার্যক্রম চলবে।

এই টিকা কর্মসূচি সফল করতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ।

প্রথমত, কাদেরকে কখন কীভাবে টিকা দেয়া হবে এর পরিকল্পনা খুব ভালোভাবে করতে হবে যেন টিকা কর্মসূচির ওই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করা যায়।

দ্বিতীয়ত, শহর, জেলা, উপজেলা, গ্রাম প্রতিটি পর্যায়ে টিকা নেয়ার ব্যাপারে এমনভাবে প্রচারণা চালাতে হবে যেন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার সবাই টিকা দিতে চান এবং খুব সহজেই টিকা পান।

তৃতীয়ত, নিবন্ধন পদ্ধতিটি অনেক সহজ করতে হবে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধনের ঝুঁকি আছে। কারণ সবার কাছে ওই সেবা পৌঁছানো যাবে না।

এ জন্য প্রান্তিক মানুষ, অক্ষর-জ্ঞান নেই, যাদের কাছে স্মার্টফোন নেই তাদেরকে নিবন্ধনের আওতায় আনার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিবন্ধন করা উচিত, যাতে কেউ বাদ না পড়ে। শহরে এই কাজটি স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে করা যেতে পারে বলে বেনজির আহমেদ পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মানুষ যেন সহজেই টিকা পায় এ জন্য টিকা কেন্দ্র বাড়াতে হবে। এক কথায় মানুষ যেন পাড়ায় পাড়ায় টিকা দিতে পারে। এ ছাড়া টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা তার দিকে নজরে রাখতে হবে। কারো কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নাহলে এ থেকে গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা থাকবে। প্রতিটি কেন্দ্রে যথাযথ তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি আরো বলেন, অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা যে তাপমাত্রায় সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, এই তাপমাত্রায় সংরক্ষণের সক্ষমতা সারা বাংলাদেশে আছে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ যেন নিরবচ্ছিন্ন হয় ওই দিকে নজর দিতে হবে।

গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালের সিনিয়র নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে এক ডোজ টিকা দেয়ার মাধ্যমে এই টিকা কর্মসূচি শুরু হয়। ওই দিন মোট ২৬ জনকে টিকা দিয়ে হয়েছিল। পর দিন পাঁচ শতাধিক ফ্রন্টলাইনারকে এই টিকা দেয়া হয়।

ওই দুই দিনে যে ৫৬৭ জন টিকা নিয়েছিলেন তাদের কারো মধ্যে গুরুতর কোনো উপসর্গ দেখা না দেয়ায় এবার দেশব্যাপী শুরু হতে যাচ্ছে এই টিকা কার্যক্রম।

www.surokkha.gov.bd এ ওয়েব পোর্টালে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে টিকার জন্য নিবন্ধন করতে হবে।

নিবন্ধন সম্পন্ন হলে মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ভ্যাকসিনের তারিখ ও কেন্দ্র জানিয়ে দেয়া হবে। অথবা ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে কেন্দ্রে গেলে নিবন্ধন করা যাবে। নিবন্ধনের ভিত্তিতে কেউ টিকা দেয়ার পর তাকে একটি কার্ডে পরের ডোজের সময় ও তারিখ লিখে দেয়া হবে। প্রথম টিকা নেয়ার চার থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। নাহলে প্রথম ডোজ অপচয় হয়ে যাবে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, দেরী না করে প্রথম ডোজের চার সপ্তাহের মধ্যেই দ্বিতীয় ডোজ নিতে।

গত মাসেই ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত ব্রিটেনের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ৭০ লাখ ডোজের চালান বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। এরমধ্যে ৫০ লাখ ডোজ বাংলাদেশের কেনা, বাকি ২০ লাখ উপহার হিসেবে পাওয়া।

ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৫ লাখ ডোজ টিকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যেন প্রথম চালানের টিকা যারা নেবেন, তাদের সবার দুই ডোজ সম্পন্ন করা যায়। তবে প্রতি মাসে ভারত থেকে ৫০ লাখ করে জুন মাসের মধ্যে আরো আড়াই কোটি ডোজ টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

সার্চ/অনুসন্ধান করুন